
২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। এই সময়টি যাত্রাবাড়ী গণহত্যা নামে পরিচিত। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল এক আন্দোলন। ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যুর পর তা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলন সাধারণ মানুষের অধিকারের দাবিতে শুরু হয়েছিল। তবে এটি শেষ হয় এক ভয়াবহ রক্তস্নানে। বিশেষ করে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা পরিণত হয়েছিল এক বধ্যভূমিতে।
আজ আমরা সেই দিনের ঘটনা ফিরে দেখব। দেশের ইতিহাসে পুলিশের হাতে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা এটি। বিবিসি-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উন্মোচন করেছে। এই প্রতিবেদন হত্যাকাণ্ডের পেছনের সত্য তুলে ধরে।
মৃত্যুর মিছিল যাত্রাবাড়ীতে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু যাত্রাবাড়ীতেই একদিনে কমপক্ষে ৫২ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারিগর কারা? বিবিসি-এর অনুসন্ধান নতুন ফরেনসিক তথ্য এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেছে, যা এই ঘটনার গভীরে আলোকপাত করে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো ১৮ই জুলাই ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপ। ফরেনসিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এই প্রাণঘাতী হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। ফোনালাপে শোনা যায়, তিনি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ওই ফোন কলের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে নিশ্চিত করেছে যে, সেটি শেখ হাসিনার কণ্ঠ।
পুলিশের উন্মত্ততা ও নীরব সাক্ষী
এই ফোনালাপ এবং অন্যান্য প্রমাণ বাংলাদেশ পুলিশকে সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। টানা ৩৬ দিনের অস্থিরতার সময়, শত শত ভিডিও, ছবি ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিভাবে পুলিশ নির্বিচারে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়েছিল।
৫ই আগস্টের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেদিন যাত্রাবাড়ীতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে মানবঢাল হিসেবে অবস্থান করছিলেন, যা পরিস্থিতিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছিল। কিন্তু সামরিক সদস্যরা এলাকা ছাড়ার পরপরই পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায়। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে শান্ত এলাকাটি পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। মিরাজ নামের এক আন্দোলনকারী, যিনি ভিডিও ধারণ করছিলেন, পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই যাত্রাবাড়ী গণহত্যা ছিল এক মর্মন্তুদ ঘটনা।
শুধু ৫ই আগস্ট নয়, এর আগের কয়েকদিন ধরেও ঢাকা জুড়ে সামরিক গ্রেডের রাইফেল মোতায়েন ও ব্যবহার করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, তা এসব প্রমাণেই স্পষ্ট। যাত্রাবাড়ী, ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এটি আন্দোলনের একটি মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বিচারের কাঠগড়ায় কারা?
এই হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা ছাড়াও কয়েকজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার নামও জড়িত হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে তৎকালীন যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুনুর রশিদ, ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রধান হাবিবুর রহমান, এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান অন্যতম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মোট ২০৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে, যাদের মধ্যে ৭৩ জন বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। তবে, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন, এবং মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিরা এখনও বিচার এড়িয়ে চলছেন। যাত্রাবাড়ী গণহত্যায় ন্যায়বিচার কি আদৌ মিলবে?
এখন দেখার বিষয়, এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে কি প্রভাব রাখে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো কি শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাবে? নাকি এই কালো অধ্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়েই থাকবে?
যাত্রাবাড়ীর ৫২টি জীবন, বাংলাদেশের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত সাক্ষী। এই প্রতিবেদন কেবল একটি ঘটনাকে সামনে আনেনি, বরং জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং এমন নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
Leave a Reply